1. admin@probahomanbangla24.com : admin :
শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০২ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
বরিশাল জেলা অনলাইন প্রাথমিক শিক্ষা পেইজে লাইভ ক্লাস এ পাঠদানকারী শিক্ষকদের সম্মাননা স্মারক প্রদান অনুষ্ঠান। বগুড়া ১ আসনের সংসদ সদস্য করোনা পজিটিভ। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক। আজকের খুদে বিজ্ঞানীরাই একদিন বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধ করবে—আলী আজম মুকুল এমপি বরিশালে মুজিব শতবার্ষি উপলক্ষে মোবাইল সার্ভিসিং ইলেকট্রনিক এন্ড হাউস ওয়্যারিং ও সেলার সিস্টেম প্রশিক্ষণ এর উদ্বোধন। ভোলায় নব-নির্বাচিত আলীনগর ইউনিয়ন বিএনপি’র কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত। আইজিপি কর্তৃক বাস উপহার পেল কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ আগৈলঝাড়ায় ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ আগৈলঝাড়ায় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কমিটি গঠন গৌরনদী উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

#এক_সপ্তাহ_বেড_রেস্ট ••••

মজিবুর রহমান মন্জু
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৭ বার পঠিত

 

অনেকে বলেন হাসপাতাল নাকি আমার ২য় আবাস। এটা গত প্রায় ত্রিশ বছরের অর্জিত দুর্নাম। কেউ কেউ তো ফোন দিয়ে মজা করে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে- ‘আপনি বাসায় না হাসপাতালে?

যাই হোক আমি এখন বাসায়।

বুকের বাম পাশে হঠাৎ চিন চিনে ব্যথা নিয়ে কয়েকদিন আগে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ( National Institute of Cardiovascular Diseases- NICVD) ভর্তি হয়েছিলাম।

আমার যেকোন অসুস্থতায় আমি প্রথম ফোন দিই প্রিয় মানুষ ছোট ভাই ডাক্তার মনসুর কে, মনসুর কে ফোনে না পেয়ে কল দিলাম মুগদা হাসপাতালের ডা. আবু সাঈদ শিমুল কে। সে পরামর্শ দিল ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ইমার্জেন্সিতে যাবার জন্য সে সেখানে বলে দিবে। কিছুক্ষণ পর ফোন কল ব্যাক করে মনসুর বললো হার্ট ফাউন্ডেশনে না গিয়ে এনআইসিভিডিতে যেতে। সেখানে ডা. ঝুমু আছেন কোন অসুবিধা হবেনা। ডা. ঝুমু সন্ধানীর জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এনআইসিভিডি তে গিয়ে তার প্রমান পেলাম।
আশা ছিল তারা টেস্ট টুস্ট করে ছেড়ে দিবে। হাসি মুখে বলবে- না কোন সমস্যা নাই, আপনার হার্ট ভাল আছে। কিন্তু নাক মুখ ঢাকা মাথায় হেলমেটের মত আচ্ছাদন দেয়া ডাক্তার দীর্ঘক্ষণ আমার ইসিজি রিপোর্ট নাড়া চাড়া করে কপালে ভাঁজ টেনে বললেন
আপনি কী কোন স্ট্রেসে আছেন?
আমি ইতস্তত করে বললাম জ্বি আছি।
আপনার ইসিজি তে একটু সমস্যা আছে মনেহচ্ছে। আপনাকে আমরা একটু অবজারভেশনে রাখবো।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। ঘড়িতে তখন বিকেল ৩টা। ৪টায় একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। কিছু ভাবার আগেই তড়িৎ গতিতে হুইল চেয়ার এনে আমাকে ইমারজেন্সি রোগী বানিয়ে সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) তে নিয়ে যাওয়া হল। হাসপাতালে যাবার সময় আমার সঙ্গী হয়েছিল মেডিক্যাল ফিফথ্ ইয়ারে পড়া এক ছোট বোন ‘ছোঁয়া’ ও তার তরুণ সুদর্শন হাজবেন্ড ‘হাসান’। হুইল চেয়ারে বসা অবস্থাতেই আমার ডান হাতে ক্যানোলা বসানো হলো, একটা ইঞ্জেকশন পুশ করা হলো।
হাসান পেশায় আইনজীবী, সে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো একটা বেড ম্যানেজ করার জন্য যাতে আমাকে একটু শোয়ানো যায়।

কিন্তু বেড কোথায়!
বেড-ফ্লোর কোথাও বিন্দুমাত্র জায়গা অবশিষ্ট নেই। আমি বুকের বাম পাশটা চেপে ধরে হুইল চেয়ারে বসে পুরো পরিস্থিতি দেখছি।রেস্ট্রিকটেড এরিয়া সত্বেও সিসিইউ’র ভেতর বহু মানুষ! মানুষের কত কষ্ট! ডাক্তার ও নার্সদের অবিরাম ছোটাছুটি, মানুষের আর্তনাদ, কান্না….

হঠাৎ চিৎকার সমেত বিলাপ ধ্বনিতে পুরো ওয়ার্ড কেঁপে উঠলো। এইমাত্র মারা গেলেন একজন রোগী। লাশ ঘিরে স্বজনদের সেই কী আহাজারী। একটু আগেও নাকি লোকটি কথা বলেছে। আমি দেখলাম ছোঁয়া শক্ত করে আমার হুইল চেয়ার ধরে আছে। তার ধারনা আমি নার্ভাস হয়ে যাই কিনা। এই পুঁচকে মেয়েটা কয়দিন পর ডাক্তার হবে। এসকল ওয়ার্ডে ডিউটি করবে। ওর মন শক্ত হওয়া দরকার। আমি এমন ভাব দেখালাম যে এগুলো আমার জন্য মামুলি ব্যাপার কিন্তু মনে মনে কলেমা শাহাদাত পাঠ করলাম।

কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই মৃত রোগীর বেড খালি হলো, সেই বেডে স্থান পেলেন ফ্লোরে শোয়া একজন মুমুর্ষ রোগী আর সেই ফ্লোরের অস্থায়ী বিছানায় স্থান পেলাম আমি। ময়লা বালিশ বিছানা পরিবর্তন ছাড়াই আমাকে শুইয়ে দেয়া হল, বলা যায়না সেটাও একটু পরে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। কালবিলম্ব না করে আমার শুয়ে পড়া দেখে ছোঁয়া একটু অবাক হল।
সে হয়তো জানেনা এরকম হাসপাতালের ফ্লোর, জেলখানায় টয়লেটের সামনের স্যাতস্যাঁতে স্থান, থানা হাজতে কফ, থুতু, সিগারেটের ছাই, ময়লা আবর্জনার মাঝে খবরের কাগজ বিছিয়ে দিব্যি ঘুমানোর অভ্যাস আমার আছে।

আসল কথা হলো ইঞ্জেকশন দুটো পুশ করার পর আমার মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। একজন নার্স এসে ৬/৭ টি টেবলেট দিলেন খাবার জন্য আর নাভীর পাশে আরেকটি ইঞ্জেকশন পুশ করলেন। হাল্কা ব্যাথা নিয়ে আসা একটা মানুষ আমি যেন আধমরা হয়ে গেলাম। ফ্লোরে আমার পাশের যে রোগী ছিল তার এটেনডেন্ট (সম্ভবত তার মা) সস্নেহে বললেন বাবা এতগুলো টেবলেট একসাথে খেওনা একটা দুটা করে খাও, গলায় আটকে যাবে। আমি একমুঠ টেবলেট একসাথে পানি দিয়ে গিলে ফেললাম দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন।

আমি বেঁহুশের মত চোখ বন্ধ করে কতক্ষণ পড়ে থাকলাম জানিনা। সম্বিত ফিরে ফেলাম তখন, যখন হাসান এসে বললো কষ্ট করে আপনাকে বেডে যেতে হবে। আপনার জন্য একটা বেড ম্যানেজ হয়েছে। অন্য সময় হলে আমি তাকে বকা দিতাম, কিন্তু আমি কিছুই বললাম না। অনেকটা টলতে টলতে একজনের কাঁধে ভর করে কিছুটা দুরে একটা খালি বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। নিশ্চয় কিছুক্ষণ আগে এখানকার রোগীও মৃত্যুর কোলে সমর্পিত হয়েছেন।
নানা রকম টেস্টের জন্য কয়েক সিরিঞ্জ রক্ত নেয়া হল। সেই বিছানায় বসে কোন রকমে আসর, মাগরিব আদায় করলাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই হাসান ও ছোঁয়া জোর করে কেক ও কলা খাওয়ালো। রাজ্যের ক্লান্তি ও ঘুম আমার চোখে। আমি উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, কান্না, গেঙ্গানির শব্দের মাঝেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুমের মধ্যেই নার্স এসে আমার প্রেসার মাপলেন। কানের কাছে মুখ এনে আলতো করে বললেন-
: আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?
: জ্বি পাচ্ছি
: কেন! ভয় পাওয়ার তো কিছু হয়নি।
: আমার ছোট ছেলেটার একটা টেবিল ফ্যান আছে, সেটা নষ্ট হয়ে আছে বেশ কয়েকদিন। আজ তাকে চুড়ান্ত কথা দিয়েছিলাম ইলেকট্রিশিয়ান এনে সেটা মেরামত করে দিব।
ভদ্র মহিলা একটু হাসলেন, মনেহচ্ছে খুব মায়া হলো আমার জন্য।
: আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন, চিন্তা করবেন না।
: আমি মরে গেলে খুব ভাল হতো।
: ছি ছি কেন এমন বলছেন?
: অনেকে আমার উপর রাগ, অনেক ক্ষোভ-ঘৃণা তাদের। আমার মৃত্যুতে তারা খুব খুশী হতো।
: কিন্তু আপনার স্ত্রী সন্তান, আত্মীয় স্বজন?
: হ্যাঁ তা সত্য ওরা খুব একা হয়ে যাবে, ওদের খুব কষ্ট হবে।
নার্স আমার সাথে গল্প জুড়ে দিল—
: জানেন আমি একবার আমার বন্ধুর সাথে অভিমান করে মরতে চেয়েছিলাম, একসাথে অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যার এটেমপ্ট নিয়েছিলাম।
: তাই নাকি! তারপর?
: আমার সে বন্ধু পাগলের মত হয়ে গেছিল। তার চেষ্টায় আমি শেষ পর্যন্ত মরতে পারিনি বেঁচে যাই।
: ও আল্লাহ! আপনার সে বন্ধু এখন কোথায়?
: সুস্থ হবার পর ৬ মাসের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আর গত ২ মাস আগে তার সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে।

আমার গভীর তন্দ্রা ছুটে গেল, বুঝতে পারলাম ক্ষনিকের জন্যে স্বপ্নে ঢুকে পড়েছিলাম। স্বপ্নের কোন ব্যাকরণ নেই, পরিবেশ পরিস্থিতির বাছ বিচার নেই।
মানুষ একটা কাজ খুব সহজে করতে পারে সেটা হলো স্বপ্ন দেখা। স্বপ্নে মানুষের চিন্তার গতি নাকি আলোর গতির চেয়েও কয়েক কোটি গুন বেশী। আমেরিকান খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার জন আপডাইক স্বপ্ন সম্পর্কে চমৎকার একটা কথা বলেছেন যা আমার খুব পছন্দ। তিনি বলেছেন-
“স্বপ্ন সত্যি হয়। যদি তা না হত, তবে স্রষ্টা আমাদের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা দিতেন না”

অনেক রিকোয়েস্ট করার পর ছোঁয়া আমার বেডের পাশে একটি টেবিল টেনে বসেছে। তার স্মার্ট হাজবেন্ড পাশে দাড়িয়ে তাকে অনবরত জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে। আজকে তোমার ট্রেনিং হচ্ছে, এইযে দেখ এরকম কঠিন পরিবেশে কাজ করতে হবে, তোমাকে এখন থেকে অভ্যস্থ হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মেয়েটা একদম ছোট, খুব মায়া লাগিয়ে কথা বলে, সে চুপ চাপ শুনে যাচ্ছে। আমি হলে ওর বরের মুখে একটা স্কচটেপ এঁটে দিতাম।

পাশের বেডের রোগীনির অবস্থা খুব ভাল না। ডাক্তার নার্সরা ঘন ঘন আসছেন। তার ছেলে মেয়েরা মা মা বলে কী কী যেন বলছে। মহিলা কাঁদছেন আর অস্ফুট স্বরে অনেক উপদেশমূলক কথা বলছেন। একটা কথা শুধু বুঝতে পারলাম তিনি বলছেন-‘আমার নাতি নাতনি গুলারে মাইরোনা, ওরা ছোট’। আমার বুকটা হু হু করে উঠলো। ইচ্ছা হচ্ছিল ঘুরে ঘুরে সব রোগীদের একবার দেখি।

এরমধ্যে বুকে ব্যথা নিয়ে আমার হাসপাতালে ভর্তির কথা এক কান দুই কান হয়ে গেল। খবর পেয়ে তারেক এসে হাজির। তার বাবা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি তারপরও সে ছুটে এসেছে। ছুটে এসেছে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধু ও এক ছোট ভাই। তারা এখন বড় হাসপাতালের বড় কর্তা। কোন মতামত জানতে না চেয়েই তারা নিজেরা আলাপ করে সিদ্ধান্ত জানালো এই হাসপাতালে এরকম পরিবেশে আমাকে রাখা যাবেনা। তারা এম্বুলেন্স নিয়ে এসেছে এখনই আমাকে যেতে হবে ইবনেসিনা’য়। কিছু বলার আগেই ডিসচার্জ ফাইল এসে হাজির। বুঝলাম সব হাসানের কারসাজি। আমি যখন প্রস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনই দেখলাম পাশের বেডটা টেনে কোথায় যেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোঁয়া আমাকে ফিস্ ফিস্ করে বললো মহিলা মারা গেছেন।

মৃত্যু দূত আজরাঈলের আশপাশে আর বেশীক্ষণ থাকা হলোনা। ইতোমধ্যে মেজবাহ ভাইও এসে গেছেন। এম্বুলেন্সে সাইরেন বাজিয়ে আমাকে সোজা এনে ঢুকানো হলো ইবনেসিনার সিসিইউতে। কর্ণেল (অব.) ডা. জেহাদ খানের হাসিমাখা মুখ দেখে আমার ব্যাথা কষ্ট সব উবে গেল। শুরু হল আবার ইনভেস্টিগেশন, রক্ত নেয়া, ইসিজি, কী কী সব তার টার স্ক্রু বসানো হলো বুকে পেটে চারিদিকে। একজন তরুণ ডাক্তার এসে বললেন চেষ্ট পেইন কে আমরা ওভার ইম্পরটেন্স দিয়ে থাকি এটাই প্রটোকল। একের পর এক ভাইয়েরা আসছেন দেখতে। বাসার লোকেরাও খবর পেয়ে গেছে। ঘুম ঘুম চোখে আমি কাকে কী বললাম কিছু মনে নেই। শুধু ডাক্তার বললেন রিপোর্ট ভাল আশাকরি সকালে আপনাকে ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করতে পারব।

সকালে আমার ব্যাথা আবার বাড়লো, তাই আর ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করা হলোনা। একদল ডাক্তার এলেন গোল হয়ে দাড়িয়ে রিপোর্টগুলো হাতে নিয়ে শলা পরামর্শ করলেন, ডা. মিনার ভাইকে ফোন করলেন, আরও কার কার যেন মতামত নিলেন। শেষতক কর্নেল জেহাদ খান জানালেন তিনি নিশ্চিত হবার জন্য এনজিওগ্রাম করতে চান।

এনজিওগ্রাম’ শুনলে সবার মনে একটা ভীতি জাগ্রত হয়। হাতের ধমনী হয়ে একটা ধাতব যন্ত্র হৃদপিন্ড পর্যন্ত পৌঁছাবে। সেখান থেকে হৃদপিন্ডের ছবি পাঠাবে। কিছুই হয়তো হবেনা আবার হতে পারে ভয়ানক কিছু।

আমি এনজিওগ্রাম করতে সম্মত হলাম। ডা. মিনার ভাই আসলেন উনি বন্ডে স্বাক্ষর করলেন। বড় আপা কখন এসে শিয়রের পাশে দাঁড়ালেন খেয়াল করিনি। তাঁর চোখ ছলছল। ডেম কেয়ার ভাব নিয়ে হুইল চেয়ারে চড়ে আমি ক্যাথল্যাবের দিকে রওয়ানা হলাম।
ল্যাবের বেডে শুইয়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই আমার হাত পা বেঁধে ফেলা হল এবং ডান হাতে লোকাল এনেসথেসিয়া দেয়া হল। একজন সার্জন বললেন একটু ব্যাথা এবং গরম লাগবে কষ্ট করে সহ্য করতে হবে। আমি হাসি মুখে বললাম ব্যাথা আর গালি গালাজ আমি খুব সহ্য করতে পারি সমস্যা নাই।

এনজিওগ্রাম চলাকালে কর্নেল ডা. জেহাদ খান খুব মজা করছিলেন। তিনি বললেন আরে আপনার ডান পাশের আর্টারি তো একেবারে সিংহের মত। একদম ক্লিয়ার কোন সমস্যা নাই। মিনার ভাইও তাতে কণ্ঠ মেলালেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর দেখলাম এবার তারা একটু চুপ। কথা বলছেন চাপা স্বরে। আমি বললাম কী ব্যাপার এখন আপনাদের কণ্ঠ ম্লান কেন, কোন সমস্যা? তারা জবাব দিলেন না। বুঝলাম কিছু সমস্যা তারা পেয়েছেন যা আমাকে শোনাতে চাচ্ছেন না। পরে বুঝলাম বাম পার্শের মূল আর্টারি ও ব্রাঞ্চে সামান্য কিছু ঝামেলা আছে। ঝামেলা মানে ব্লক। ৬০-৭০ পারসেন্ট ব্লক। ঔষধে না সারলে স্টান্টিং করতে হবে। ডাক্তার ১ সপ্তাহের অবজার্ভেশন ও ফুল বেড রেস্ট দিয়েছেন।

আজ আমার ১ সপ্তাহ শেষ। বন্দী জীবন খুব বিরক্তিকর। মানুষ ফোন করে আন্তরিকতা দিয়ে কুশল জানতে চায়, বিভিন্ন চিকিৎসা, অভিজ্ঞতা ও ঔষধের কথা বলে। শুনতে শুনতে আসলে বিরক্তি লাগে, রেস্ট হয়না। তবুও হাসি মুখে শুনতে হয়।

ঔষধের তালিকায় ঘুমের ঔষধ থাকায় ইদানীং ঘুম প্রচুর বেড়ে গেছে। আজ সকালে কোরআন পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমের মধ্যে দেখলাম এনআইসিভিডি’র সেই নার্স বিষন্ন মুখে দাড়িয়ে আছে। পাশে এক ছিপছিপে যুবক, তার মাথা নীচু।
আমি সালাম দিলাম।
মেয়েটা ঝর ঝর করে কেঁদে দিল।
: কী ব্যাপার কাঁদছেন কেন?
: ও ফিরে এসেছে, হাত জোড় করে সরি বলছে। আমি এখন কী করবো বলুন।
আমি কিছু না ভেবেই বললাম আপনি কী করবেন তা তো বুঝতেই পারছি।
: কী করবো?
: এই যে আপনি কাঁদছেন, কিছুক্ষণ পর হাসবেন, আবার হয়তো কখনও কাঁদবেন।
মহিলা চোখ মুছে ফেললেন। সত্যি সত্যি তার মুখে হাসি।
আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

আমার ছোট ছেলেটা খুব খুশী। তার বাবা হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে এবং তিনি ইলেকট্রিশিয়ান এনে তার টেবিল ফ্যানটা মেরামত করে দিয়েছে।

ছবি: প্রতীকি

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© probahomanbangla.com © 2020
কারিগরি সহযোগিতায়: মোস্তাকিম জনি